করোনা হাওয়ার বাদল দিনে বর্ষা ঋতুর শুরু

0

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বর্ষার আবহে বলেছিলেন, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’ আর ১৪২৭ বঙ্গাব্দের বর্ষা ঋতুর সূচনার দিনে বলতে হচ্ছে ‘করোনা হাওয়ার’ বাদল দিনে। সোমবার ১৫ জুন তারিখটি যখন ক্যালেন্ডারে, তখন প্রকৃতিতে পহেলা আষাঢ়।

এই ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে’ রিমঝিম বৃষ্টির শব্দে কানে কানে বর্ষার আনুষ্ঠানিক আগমন বার্তা ঘোষিত হয়। যদিও বিশ্বজুড়ে করোনার তাণ্ডব তবুও বর্ষা নিজস্ব জলবিন্দুতে ভিজিয়ে দেবে তাপিত ও পীড়িত চরাচর, বেদনার্ত মানুষের হৃদয়; প্রকৃতিতে জাগাবে জল-কল্লোলিত প্রাণাবেগ।

বিভা ও বৈচিত্রময় ষড়ঋতুর  বাংলাদেশে পরিবেশ ও প্রকৃতিতে রূপের পসরা সাজিয়ে ঋতুর পরে ঋতু আসে আর যায়। বাঙালির বর্ষ শুরু হয় কঠোর খরতাপে। গ্রীষ্মের দাবদাহের পর আসে জলের শীতল স্পর্শে বর্ষা। তারপর উদার শরৎ, বিষন্ন হেমন্ত পেরিয়ে হিম হিম পরশে কুয়াশার চাদরে ঢাকা স্বপ্নালু শীত। অবশেষে চৈতালি বাতাসে ভেসে ঋতুরাজ বসন্ত।

ঋতু চক্রে বর্ষার আগমন ঘন কালো মেঘ, বজ্র ও বৃষ্টিতে প্রকম্পিত। অবিরাম বৃষ্টির নাচনে জল সিঞ্চন করে বর্ষা জাগায় প্রকৃতি ও প্রাণিজগৎ।  অনিন্দ্য বর্ষায় বাংলার প্রকৃতি পায় নতুন মাত্রা। জরাজীর্ণ গ্রীষ্মক্লান্ত প্রকৃতিকে বর্ষার আকাশ-ভাঙা জলে স্নান করিয়ে সিক্ত হয় ধরণীতল।

জলরঙে রাঙিয়ে দেয়া বর্ষাকাল বাংলাদেশের ঋতুচক্রের দ্বিতীয় ঋতু হলেও তা অন্যতম প্রধান ঋতু। বৃষ্টিবহুল বাংলার সাথে বর্ষায় আত্মীয়তা শাশ্বত, যা প্রখর গ্রীষ্মের  বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসের শেষে আষাঢ়ে ও শ্রাবণে আসে জলের ছোঁয়ায়।  বর্ষা ঋতুর সমগ্র প্রহর বৃষ্টিধারার ধ্বনিতে মুখর হয় জগৎ ও  জীবনের সবদিক। বর্ষার বৃষ্টিভেজা বাতাস শিহরণ জাগায় সর্বত্র। গ্রীষ্মের তাপে জরাজীর্ণ উদ্ভিদ বর্ষার নবীন মেঘের আহ্বানে উদ্বেলিত হয়। বহুদিনের প্রতীক্ষিত বারিধারায় রোমাঞ্চিত হয় নগর-পল্লীর জনজীবন ও বৃক্ষরাজি।

প্রকৃতিতে স্নিগ্ধ ও বৃষ্টিভেজা আবেশ দেখা যায় বর্ষায়। প্রস্ফুটিত হয়  নানা ফুল ও পত্রালি, যার মধ্যে অপরূপ সৌন্দর্যে কদম অন্যতম। কবির ভাষায় যা ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ উপমায় উদ্ভাসিত। কদমের আবহে বর্ষার এক পশলা বৃষ্টি তখন নতুন মাত্রায় ও ছন্দে পরিপূর্ণতা দেয় সকল প্রতীক্ষা ও  প্রত্যাশায়। শীতল করে দেয় সব তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের উত্তাপ। দোলা দেয় বর্ষা-প্রেমিক মানুষের অন্তর্গত মনের গোপন-গহীনের প্রেমময় অনুভূতিতে।

বাংলায় গৌরবময় বর্ষা ঋতুর নেপথ্যে রয়েছে সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক কারণ। গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে মৌসুমি বায়ু ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং উত্তর-পূর্বে বয়ে যায় প্রচুর পরিমাণে জলীয়বাষ্প বুকে ধরে। হিমালয়ের গায়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে তা দক্ষিণ-পূর্বের বাংলাদেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায় বর্ষাকালের দিনগুলোতে।

বৃষ্টি-মাখা  বর্ষায় এক অনন্য বাংলার সবুজ-শ্যামল  চিত্র ফুটে ওঠে। বর্ষার অপার সৌন্দর্যে শোভামন্ডিত হয় চিরায়ত বাংলা। পুকুর, খাল, বিল, নদী বৃষ্টির পানিতে হয় টইটুম্বুর। বৃক্ষরাজির ওপর বৃষ্টির ফোঁটা অনাবিল শোভার সৃষ্টি করে। বর্ষার মেঘলা দিনের মাতাল হাওয়া বনে বনে পরশ বুলিয়ে যায় আকুল হৃদয়ের আর্তিতে। যেমন বলেছেন বাংলার কবি জসীম উদ্দীন তাঁর ‘পল্লীবর্ষা’ কবিতায়: ‘বেনুবনে বায়ু নাড়ে এলোকেশ/ মন যেন চায় কারে।’

বর্ষাকাল বাংলাদেশের জন্য বয়ে আনে অপার সম্ভাবনার বার্তা। বর্ষার পানিতে সতেজ হয়ে ওঠে ফসলের মাঠ আর হাসি ফোটে কৃষকের মুখে। শহরের চেয়ে বর্ষাকাল গ্রামীণ জীবনে অনেক বেশি সরব। জলমগ্ন চরাচরে তখন বিচ্ছুরিত হয় বিম্বিত আলোর অপরূপ নকশা। রমনীরা তখন ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পের পরম্পরায় ঘরে ঘরে নকসী কাঁথায় ফুল তোলে।

শহর জীবনে বর্ষা যত না নান্দনিক, তারচেয়ে বেশি দুর্ভোগের। বর্ষার বৃষ্টি শহরের আকাশে বাতাসে উড়ে চলা ধূলোবালিকে অনেকটাই বশ করে ফেললেও রাস্তাঘাটে সৃষ্টি করে জলাবদ্ধতার। বর্ষায় শহরের ব্যস্ত মানুষগুলো একটু নির্মল হাওয়ায় নিঃশ্বাস ফেলতে পারলেও তাদের চলার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। তবে

কৃষিভত্তিক বাংলার অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বর্ষা। বাংলার কৃষি অনেকটাই বৃষ্টিনির্ভর। পরিমিত বৃষ্টিপাত বাংলাদেশে প্রচুর ফসল ফলাতে সহায়তা করে বর্ষার আগমনের মাধ্যমে।

বর্ষাকালে নদীমাতৃক বাংলার নদ-নদী পূর্ণযৌবনা হয়ে ওঠে। কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে নদীগুলো ফিরে পায় মৌলিক সৌন্দর্য। নদীর পাড়ের সবুজ ঘাস আরো সবুজ হয়ে ওঠে। যতদূর চোখ যায় শুধু পানি, তারপর লম্বা একটি গ্রামের রেখা, তার উপরে শুধু মেঘ আর মেঘ। এ সময় বিলে ঝিলে ফোটে শাপলা-শালুক। হিজল আর কেয়াফুলের অরূপ দৃশ্য বর্ষাকে দেয় নতুন মাত্রা। বর্ষার ফলের মধ্যে অন্যতম ফল আনারস, আমড়া, পেয়ারা প্রভৃতি।

বর্ষার প্রকৃতি মানুষের হৃদয় কাড়তে জানে। রূপের আকর্ষণে উতলা করতে পারে মানব হৃদয়। বাংলা সাহিত্য, সংগীতে বর্ষার সেই আবাহন শোনা যায় বহু কবি ও শিল্পীর রচনায়। বর্ষার রূপ, রং, ভেজা গন্ধ-সব কিছুই আপন মহিমা আর সৌন্দর্যে ভাস্বর জীবন ও সাহিত্যের আঙিনায়।

চলমান করোনাকালে বিপন্ন মানুষ রয়েছে প্রকৃতির চেয়ে দূরে, সামাজিক দূরত্বে, সঙ্গরোধে। বর্ষার মাতাল হাওয়ার সাথে এসেছে করোনার পাগলা হাওয়াও। এমন বর্ষা অচিন্তনীয়, অভূতপূর্ব। তবু বর্ষা তার মেঘে ও বর্ষণের জলকণায় ভরপুর সাহসে, প্রেমে সিক্ত করবে বাংলার পবিত্র ভূমিতট আর বাঙালির চেতনার মর্মমূল। বর্ষার উড্ডয়মান কৃষ্ণ মেঘ যেমন বিলীন হয় আশাবাদী বৃষ্টিতে, করোনার বিপদও তেমনি হারিয়ে যাবে একদিন, কোনো এক বর্ষাকালের তুমুল বর্ষণের প্রবহমান জলস্রোতের  সাথে।

একটি উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে